মন্ত্রিসভায় জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতিমালা-২০১৮’র খসড়া অনুমোদন
ডেক্স

2018-03-20

যুদ্ধকালীন বা সংকটে সব আধা সামরিক বাহিনী ও সহায়ক বাহিনী থাকবে সশস্ত্র বাহিনীর কর্তৃত্বে অপারেশনাল কমান্ডে- এমন বিধান যুক্ত করে জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতিমালা-২০১৮ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। পাশাপাশি ভেজাল সার বিক্রির শাস্তি বাড়িয়ে সার (ব্যবস্থাপনা) (সংশোধন) আইন-২০১৮ এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এছাড়া বৈঠকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৮ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউট আইনের খসড়াও অনুমোদন দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব বিষয়ের অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতিমালা তৈরি করেছে উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এটি একটি ব্রডবেইজ (বিস্তৃত) নীতিমালা। সুনির্দিষ্টভাবে আইনের মতো নয়, নীতিমালা হওয়ায় জেনারালাইজ ফর্মে এটি আনা হয়েছে। এটি বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনে দেয়া হয়েছে। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু একটি নীতিমালা দিয়ে গেছেন। সেটার ওপর ভিত্তি করে আরও বিস্তৃতভাবে নতুন নীতিমালাটি করা হয়েছে। এতে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় সরকারের সাধারণ রূপরেখা বর্ণিত হয়েছে। সংকটকাল বা ক্রান্তিকাল ঠিক করবেন সরকার প্রধান। ক্রাইসিস বা যুদ্ধকালীন আধা সামরিক ও সহায়ক বাহিনী থাকবে সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ডে। যেমন বিজিবি, কোস্টগার্ড, বিএনসিসি, পুলিশ বাহিনী, আনসার, গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী অন্যান্য প্রতিরক্ষা দল ক্রান্তিকালীন সেনবাহিনীর সঙ্গে কাজ করবে। এ নীতিমালায় জাতীয় স্বার্থ, প্রতিরক্ষা মূলনীতি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, সামরিক ও বেসামরিক সম্পর্ক কী, গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক কী এ ধরনের বিভিন্ন বিষয় নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে। এ প্রতিরক্ষা নীতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের প্রতিরক্ষা পরিবেশ সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করবে। এছাড়া এ দলিল সার্বিক পরিসরে প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগের চলমান ও পরিকল্পিত সক্ষমতা এবং ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা দেবে। মুখ্য জাতীয় মূল্যবোধগুলো, জাতীয় লক্ষ্য ও প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্য, জাতীয় স্বার্থ, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো নীতিমালার মধ্যে আনা হয়েছে। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্থাৎ সশস্ত্র বাহিনীর মূল সক্ষমতা কী হবে, যুদ্ধকালীন সশস্ত্র বাহিনী কিভাবে মোতায়েন হবে এসব বিষয়ে নীতিমালায় বিস্তারিত বলা হয়েছে। শফিউল আলম বলেন, সামরিক ও অসামরিক সম্পর্ক কী হবে, সশস্ত্র বাহিনী ও নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে এটা আরেকটা চ্যাপ্টারে বলা হয়েছে। গণমাধ্যমের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক কী হবে সেটাও ডিটেইল করা আছে। নীতিমালা অনুযায়ী সংসদ আগের মতোই প্রতিরক্ষা বিষয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করবে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা প্রতিরক্ষা বিষয়গুলো ডিল করবে। গণমাধ্যমের সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সচেতন নাগরিক সশস্ত্র বাহিনীর সবচেয়ে ভালো বন্ধু। নিরাপত্তা সম্পর্কিত অনুমোদিত তথ্য দায়িত্বশীল প্রচারের মাধ্যমে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সুতরাং একটি বন্ধুপ্রতিম গণমাধ্যম-সামরিক সম্পর্ক অপরিহার্য। গণমাধ্যম-সামরিক সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এ দুটি প্রতিষ্ঠান জাতীয় সক্ষমতার উপাদান। উভয়ই নিজ নিজ অবস্থান থেকে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাড়ছে ভেজাল সার বিক্রির সাজা : ভেজাল সার বিক্রিতে সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে নতুন আইনের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের বলেন, আইনের ৮(১) ধারা লঙ্ঘনে বা ভেজাল সার বিক্রিতে ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৩০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড ছিল। সেখানে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০০৬ সালের এ আইনের সংজ্ঞায় একটি শব্দ যুক্ত করা হয়েছে তা হল- ‘আবশ্যকীয় উদ্ভিদ উপাদান’, সংযোজনে পুষ্টির বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সংজ্ঞার ২ এর ২০ অনুচ্ছেদে ‘মিক্সড ফার্টিলাইজার’ পরিবর্তন করে ‘সুষম সার’ করা হয়েছে বা ‘মিক্সড ব্যালেন্স ফার্টিলাইজার’ করা হয়েছে। এছাড়া আইনে জাতীয় সার প্রমিতকরণ কমিটি ১৫ সদস্য থেকে ১৭ সদস্য করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন : এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ১৯৯২ সাল থেকে এ প্রতিষ্ঠানটি রেজুলেশনের মাধ্যমে চলছে। এটার কোনো আইন ছিল না, এটিকে আইনে পরিণত করা হয়েছে। সরকার যেটুকু ঘোষণা করবে সেটুকু বরেন্দ্র এলাকা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বরেন্দ্র এলাকা বলতে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সব জেলাকে বোঝাবে। অর্থাৎ বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগ নিয়ে এ বরেন্দ্র এলাকা গঠিত হবে। সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন করে যে কোনো এলাকাকে বরেন্দ্র এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এছাড়া বৈঠকে ‘বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউট আইন, ২০১৮’ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। রূপপুরে ভারতীয় পরামর্শক নিয়োগের চুক্তি : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকাজে ভারতীয় পরামর্শকের সেবা নেয়া সংক্রান্ত চুক্তির খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) ও ভারতের গ্লোবাল সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার এনার্জি পার্টনারশিপের (জিসিএনইপি) মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এছাড়া সভায় পায়রা বন্দরের রাদনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল অ্যান্ড মেইন্টেন্যান্স ড্রেজিং কম্পোনেন্ট জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়। নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় মন্ত্রিসভার শোক : নেপালে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় ২৬ বাংলাদেশিসহ ৫১ জন আরোহী এবং মুক্তিযোদ্ধা-ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে মন্ত্রিসভা। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ১২ মার্চ নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মর্মান্তিক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় ২৬ জন বাংলাদেশিসহ ৫১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২০ জন। এ বিষয়ে বৈঠকের শুরুতে মন্ত্রিসভা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে। এজন্য একটি শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বনামধন্য ভাস্কর ও মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর মৃত্যুতে মন্ত্রিসভা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। মন্ত্রিসভা বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতিপত্র পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম। বিশ্বে দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে জাতিসংঘে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করায় সোমবার মন্ত্রিসভা তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছে। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘স্ট্যাটিক ইন্টারন্যাশনাল’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশ্বে দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করায় তাকে অভিনন্দন জানানো হয়। অর্থনৈতিক অবস্থার তিনটি বিভাগেই স্থিতিশীলতার জন্য ১৫ মার্চ ইউনাইটেড নেশন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএনসিপিডি) বাংলাদেশকে এই স্বীকৃতি দেয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল ও যোগ্য নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেন, এ সময় মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতা ও মানবিক মূল্যবোধের আন্তরিকভাবে প্রশংসা করেন। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক এক জরিপে যোগ্য নেতৃত্ব, রাষ্ট্রনায়ক, মানবতা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বিষয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে সর্বোচ্চ উপস্থিতির জন্য শেখ হাসিনাকে বিশ্বে দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রীর স্বীকৃতি দেয়া হয়। জরিপটিতে রোহিঙ্গা বিষয়ে ভূমিকা এবং তাদের আশ্রয় দেয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সসম্মানে প্রত্যাবর্তনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সফল কূটনীতিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। জরিপে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে শেখ হাসিনা যেভাবে সফল হয়েছেন, খুব কম রাষ্ট্রনায়কই তা পারেন।

বাংলাদেশ